//ব্যবসায় কি/ ব্যবসায় কাকে বলে? ব্যবসায় কত প্রকার ও কি কি?
ব্যবসায় কি/ ব্যবসায় কাকে বলে? ব্যবসায় কত প্রকার ও কি কি? Save

ব্যবসায় কি/ ব্যবসায় কাকে বলে? ব্যবসায় কত প্রকার ও কি কি?

ব্যবসায় কি/ব্যবসায় কাকে বলে?

মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে উৎপাদন ও বণ্টনসহ সকল বৈধ অর্থনেতিক কাজকে ব্যবসায় বলে। 

ব্যবসায়ের কিছু  সংজ্ঞাঃ 

লুইস হেনরি ব্যবসায়কে সংজ্ঞায়িত করেছেন, “পণ্য ক্রয় ও বিক্রয়ের মাধ্যমে সম্পদ উৎপাদন বা অর্জনের দিকে পরিচালিত মানব কার্যকলাপ”

স্টিফেনসন ব্যবসায়ের সংজ্ঞা দিয়েছেন, “মানুষের চাহিদা/আকাঙ্ক্ষার সন্তুষ্টির মাধ্যমে মুনাফা অর্জন এবং সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যে নিয়মিত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা হয়।”

একটি ব্যবসায় একটি বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপ যা মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে পণ্য বা পরিষেবা সরবরাহের সাথে জড়িত।

একটি ব্যবসায় হলো এমন একটি সংস্থা বা সত্তা যা মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে পণ্যদ্রব্য ও সেবাকর্ম ক্রয়-বিক্রয় করে। একটি ব্যবসায়ের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন করা।

ব্যবসায়ের বৈশিষ্ট্য কি?

১. পণ্য ও পরিষেবা বিনিময়:

সকল ব্যবসায় প্রণ্যদ্রব্য ও পরিষেবা ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। পণ্য ও পরিষেবা বিনিময়ের মাধ্যমে ব্যবসায় মুনাফা অর্জন করেন।

২. লেনদেনের পৌনঃপুনিকতা:

যেকোনো ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে লেনদেন বারে বারে বা অব্যাহতভাবে সম্পাদিত হয়। যেমন: একজন আম ব্যবসায়ী ‍যিনি নিয়মিতভাবে আম ক্রয় করেন এবং বিক্রি করেন। সুতরাং তিনি তার ব্যবসায়ে সবসময় আম ক্রয়-বিক্রয়ের কাজের সাথে জড়িত থাকেন। কিন্তু কেউ যদি মাঝেমধ্যে তার গাছের আম বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন, সবসময় ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত থাকে না, তাহলে তাকে ব্যবসায়ী বলা যাবে না।

৩. মুখ্য উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন:

মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যবসায় পরিচালিত হয়ে থাকে। মুনাফা অর্জন ব্যতীত ব্যবসায়ীর পক্ষে ব্যবসায় পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তবে একজন ব্যবসায়ী মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করেন।

৪. ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তা:

ব্যবসায়ের মধ্যে ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তার বিদ্যমান। ব্যবসায়ের ঝুঁকির মধ্যে যেমন: আগুন, চুরি ইত্যাদির ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে আর ক্ষতীর হাত থেকে রক্ষা পেতে ব্যবসায় বীমা করে রাখতে পারে। ব্যবসায়ের অনিশ্চয়তা হলো মানুষের চাহিদা পরিবর্তনের কারণে ক্ষতি বা দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনিশ্চয়তার বিপরীতে ব্যবসায়ী বীমা করতে পারে না কিন্তু ঝুঁকির ক্ষেত্রে বীমা করতে পারে।

৫. ক্রেতা এবং বিক্রেতা:

প্রতিটি ব্যবসায়ের লেনদেনে ন্যূনতম দুটি পক্ষ থাকে যেমন: ক্রেতা এবং বিক্রেতা। ব্যবসায়ে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে।

৬. উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ততা:

কিছু ব্যবসায় পণ্যদ্রব্য ও পরিষেবাদি উৎপাদনের সাথে সংযোগ থাকতে পারে। আর শিল্পকে বলা হয় উৎপাদনের বাহন। যেখান প্রকৃতির পদত্ত সম্পদকে রূপগত উপযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী পণ্যে রূপান্তর করে।

৭. পণ্যদ্রব্য ও সেবাকর্ম:

ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে পণ্যদ্রব্য ও সেবাকর্ম ক্রয়-বিক্রয় বা বিনিময় হয়ে থাকে। পণ্যদ্রব্যের মধ্যে রয়েছে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি এবং সেবাকর্মের মধ্যে রয়েছে সেলুন, টেলিফোন লাইন, ফায়ার সার্ভিস, ইন্টারনেট ইত্যাদি।

৮. মানুষের চাহিদা পূরণে সক্ষম:

যেকোনো ব্যবসায় তার ভোক্তাদের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টির মাধ্যমে পণ্যদ্রব্য ও সেবাকর্ম বিনিময় করে থাকেন। অর্থাৎ ব্যবসায় তার পণ্য বা সেবা উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের চাহিদা পূরণ করে থাকে।

৯. সামাজিক দায়বদ্ধতা:

ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমাজের বা মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যাবে না। তাছাড়া ব্যবসায়ীরা তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে খুব সচেতন থাকে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়ের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কাজের সাথে জড়িত থাকেন।

ব্যবসায় কত প্রকার ও কি কি?

মালিকানার ভিত্তিতে ব্যবসায় পাঁচ প্রকার:

  1. একমালিকানা ব্যবসায়
  2. অংশীদারি ব্যবসায়
  3. যৌথ মূলধনী ব্যবসায় বা কোম্পানি সংগঠন
  4. সমবায় সমিতি
  5. রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়

১. একমালিকানা ব্যবসায়:

যে ব্যবসায় একজন বা একক মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত, পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় তাকে একমালিকানা ব্যবসায় বলে। একক মালিকানা অর্থ হলো ব্যবসায়ের মালিক একজন মাত্র ব্যক্তি। একক মালিকানার মাধ্যমে পৃথিবীতে ব্যবসায়িক ক্রিয়াকলাপ শুরু হয়েছিল। তাই এটাকে সবচেয়ে প্রাচীনতম ব্যবসায় সংগঠন বলা হয়। তাছাড়াও, একমালিকানা সংগঠনকে ব্যবসায় জগতের মুরব্বি বলা হয়।

যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো সময় স্বল্প মূলধন নিয়ে একমালিকানা ব্যবসায় শুরু করতে পারে। একজন ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত হয় বলে এত মুনাফা বেশি পাওয়া যায় এবং সহজেই সফলতা আসে। 

একমালিকানা ব্যবসায়ের সুবিধা:

  • ব্যবসায়ের সকল লাভ একা ভোগ করার সুযোগ।
  • পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ।
  • মালিকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
  • স্বল্প মূলধন নিয়ে শুরু করা যায়।
  • আইনগত জামেলা না থাকায় যে কেউ ইচ্ছা করলে শুরু করতে পারে।

একমালিকানা ব্যবসায়ের অসুবিধা:

  • এ ব্যবসায়ের সম্পূর্ণ ঝুঁকি মালিককে একা বহন করতে হয়।
  • এ ব্যবসায়ের স্থায়িত্বকাল মালিকের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
  • একমালিকানা ব্যবসায়ের সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব মালিককে একা বহন করতে হয়।
  • আইনের চোখে এই ব্যবসায়ের নিজস্ব কোনো পৃথক সত্তা নেই অর্থাৎ মালিক ও ব্যবসায় অভিন্ন।

২. অংশীদারি ব্যবসায়:

যখন দুই বা ততোধিক ব্যক্তি সেচ্ছায় একত্রে মিলিত হয়ে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে চুক্তিবদ্ধ সম্পর্কের ভিত্তিতে যে ব্যবসায় গড়ে তোলে তাকে অংশীদারি ব্যবসায় বলা হয়। অংশীদারি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সাধারণত একের অধিক লোক থাকে। সাধারণ অংশীদারি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২ জন এবং সর্বোচ্চ ২০ জন অংশীদার থাকে। অন্যদিকে ব্যাংকিং অংশীদারি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২ জন এবং সর্বোচ্চ ১০ জন অংশীদার থাকে।

একমালিকানা ব্যবসায়ের সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য অংশীদারি ব্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যেখানে একাধিক ব্যক্তি মিলিত হয়ে তাদের পুঁজি ও সামর্থ্য একত্রিত করে যে ব্যবসায় গঠন করেন, তাকেই অংশীদারি ব্যবসায় বলে।

১৯৩২ সালের অংশীদারি আইনের ৪ নং ধারার মতে, “সকলের দ্বারা বা সকলের পক্ষে একজনের দ্বারা পরিচালিত ব্যবসায়ের মুনাফা নিজেদর মধ্যে বণ্টনের নিমিত্তে একাধিক ব্যক্তির মধ্যে যে চুক্তিবদ্ধ সম্পর্কের সৃষ্টি হয় তাদের প্রত্যককে অংশীদার এবং সম্মিলিতভাবে তাদের ব্যবসায়কে অংশীদারি ব্যবসায় বলা হয়”

অংশীদারি ব্যবসায়ের বৈশিষ্ট্য সমূহ:

  • একধিক সদস্য নিয়ে এ ব্যবসায় গঠিত হয়।
  • সদস্য সংখ্যা সর্বনিম্ন ২ এবং সর্বোচ্চ ২০ জন, ব্যাকিং এর ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২ এবং সর্বোচ্চ ১০ জন।
  • অংশীদারি ব্যবসায়ের মূল ভিত্তি হলো চুক্তি।
  • যেকেউ চাইলেই পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে পারে, তরে সকলের পক্ষে একজন দ্বারা অংশীদারি ব্যবসায় পরিচালিত হয়ে থাকে।
  • চুক্তি অনুযায়ী মূলধন সরবরাহ এবং মূলধন ছাড়াও অংশীদার হওয়া যায়।
  • চুক্তিতে উল্লেখ থাকলে লাভ লোকসান মূলধন অনুপাত অনুযায়ী হবে আর যদি না উল্লেখ থাকে তাহলে সমান হরে হবে।
  • এ ব্যবসায়ের দায় অসীম। সকল অংশীদার ব্যক্তিগতভাবে ও সমষ্ঠিগতভাবে দায়ী।
  • পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে অংশীদারি ব্যবসায় গঠিত হয়।
  • অংশীদারি ব্যবসায়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয় তবে নিবন্ধিত হলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।
  • অবিশ্বাস ও বিরোধ দেখা দিলে অংশীদারি ব্যবসায়ের বিলোপসাধন হয়।

অংশীদারি ব্যবসায়ের সুবিধা:

১. সমন্বিত মূলধন: দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মিলিত হয়ে এই ব্যবসায় গঠন করে ফলে মুলধনের পরিমান বেশি হয় এবং ব্যবসায় সম্প্রসারণে অধিক সহজতর হয়।

২. সম্মিলিত প্রচেষ্টা: এ ব্যবসায়ের সকল অংশীদারই ব্যবসা পরিচালনা করার অধিকার রাখে ফলে তাদের নিজস্ব স্বার্থে ব্যবসায় পরিচালনায় নিজের অবদান রাখে।

৩. দক্ষ পরিচালনা: অংশীদারি ব্যবসায়ের প্রত্যেক সদস্যদের বিভিন্ন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে খুব দক্ষতার সাথে ব্যবসায় পরিচালনা করা সম্ভব।

৪. ঝুঁকি বণ্টন: আমরা জানি যে অংশীদারি ব্যবসায়ের দায় অসীম, তাই সকল অংশীদারগণ ব্যক্তিগতভাবে ও সম্মিলিতভাবে ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক থাকার চেষ্টা করে।

৫. সম্মিলিত সিদ্ধান্ত: অংশীদারি ব্যবসায়ের একাধীক সদস্য থাকার ফলে যেকোনো সিদ্ধান নেওয়ার আগে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ফলে প্রতিষ্ঠান দক্ষতার সাথে পরিচালিত হতে পারে।

৬. ঋণ প্রাপ্তি: অংশীদারি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক বা অর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়া খুব সহজ। এ ব্যবসায়ের সম্মিলিত প্রয়াস ইতিবাচক হিসেবে কাজ করে।

৭. নমনীয়: অংশীদারি ব্যবসায়ের চুক্তির বিষয়বস্তু খুব সহজেই পরিবর্তন করা যায়। যার ফলে ব্যবসায়ের পরিবর্তিত অবস্থার সাথে খাব খাওয়ানো সহজ হয়।

অংশীদারি ব্যবসায়ের অসুবিধা:

 ১. অসীম দায়: অংশীদারি ব্যবসায়ে অংশীদারদের দায় অসীম। ব্যবসায়ের দায় কেবল অংশীদারদের মূলধনই নয় বরং ব্যক্তিগত সম্পদকেও দায়বদ্ধ করে। 

২. অনিশ্চিত স্থায়িত্ব: অংশীদারি ব্যবসায় যেকোনো সময় নির্দিষ্ট কোনো কারণে বিলোপসাধন হতে পারে। যেমন : অংশীদারদের মধ্যকার মতবিরোধ, মৃত্যু, দেউলিয়া, মস্তিষ্ক বিকৃতি ইত্যাদি কারণে ব্যবসায় বিলোসাধন হয়ে থাকে।

৩. গোপনীয়তার অভাব: ব্যবসায়ের অধিক সদস্য থাকার কারণে ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রাখা সম্ভব হয় না।

৪. অ-হস্তান্তরযোগ্য মালিকানা: যৌথ মূলধনী ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে যেমন শেয়ারহোল্ডারগণ তার শেয়ার বিক্রি করে মালিকানা হস্তান্তর করতে পারে, কিন্তু অংশীদারি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে অংশীদারগণ মালিকানা হস্তান্তর করতে পারেন না।

৫. সিদ্ধান্ত গ্রহনে বিলম্ব: অংশীদারি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সকল সদস্যের সম্মতির প্রয়োজন হয় ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয়।

৬. পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব: এ ব্যবসায়ের নিজস্ব কোনো পৃথক সত্তা না থাকার ফলে এর স্থায়িত্বকাল অনিশ্চিত। যার ফলে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বা বিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়।

৩. যৌথ মূলধনী বা কোম্পানি সংগঠন:

একাধিক ব্যক্তি সেচ্ছায় মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে কোম্পনির আইনের অধীনে যে ব্যবসায় গঠন করে তাকেই যৌথ মূলধনী ব্যবসায় বলা হয়।

একমালিকানা ও অংশীদারি ব্যবসায়ের মূলধনের সীমাবদ্ধতা, স্থায়িত্বের সীমাবদ্ধতা, আইনগত সীমাবদ্ধতা ও অসীম দায়ের ভার থেকে মুক্তি পেতে কোম্পানি সংগঠন বা যৌথ মূলধনী ব্যবসায়ের সূচনা ঘটে। কোম্পানি সংগঠন একটি আইনগত সংগঠন যা কোম্পানি আইনের আওতায় গঠিত হয়ে থাকে। সর্বপ্রথম কোম্পানি আইন পাস হয়েছে ব্রেটেনে ১৮৪৪ সালে যা “The Joint Stock Company Act 1844” নামে পরিচিত। তারপর ১৯১৩ সালে ভারতীয় কোম্পানি আইন পাস হয়। ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইনের আওতায় বাংলাদেশের কোম্পানি আইন চালু ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের সংস্কার করে, বাংলাদেশ কোম্পানি আইন ১৯৯৪ সাল করা হয়।

যৌথ মূলধীনা ব্যবসায় বা কোম্পানি সংগঠনের বৈশিষ্ট্য:

১. আইনসৃষ্ট ব্যবসায়: কোম্পানি সংগঠন একটি আইনসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। যা কোম্পানি আইনের অধীনে গঠিত, পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।

২. কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা: কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা হলো এমন এক সত্তাকে বুঝায় যা কোনো ব্যক্তি না হয়েও ব্যক্তির ন্যায় মর্যাদা লাভ করে। আইন দ্বার সৃষ্ট হওয়ায় এ সংগঠনকে তার শেয়ার মালিক থেকে আলাদা সত্তা বা কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা হিসাবে মনে করা হয়।

৩. চিরন্তন অস্তিত্ব: কোম্পানি সংগঠন কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তার অধিকারী হওয়ার ফলে এ ব্যবসায়ের অস্তিত্ব চিরন্তন। কোম্পানি সংগঠনের শেয়ারহোল্ডার বা পরিচালক ও কর্মচারির দেউলিয়া বা মৃত্যু হলেও এই সংগঠনের অস্তিত্ব বিলোপ হয় না।

৪. সীমাবদ্ধ দায়: কোম্পানি সংগঠনের শেয়ারহোল্ডারদের দায় সীমিত থাকে। অর্থাৎ আপনি যদি ১০ টাকা মূল্যের ১০০ টি শেয়ার ক্রয় করেন তাহলে আপনার দায় হবে(১০×১০০)=১০০০ টাকা। সুতরাং আপনার শেয়ার ব্যাতীত অন্যকোনো দায় নেই।

৫. নিজস্ব সিলমোহর: কোম্পানি সংগঠন কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তার অধিকারী হওয়ার এর নামে সিলমোহর থাকে। কোম্পানির সকল লেনদেনের সময এই সিলমোহর ব্যবহার করা হয় এবং সংগঠনের নথিপত্রে এর সিল ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।

৬. শেয়ার মূলধন: যৌথ মূলধনী ব্যবসায়ের সমস্ত মূলধনকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমান অংশে ভাগ করা হয়, যাকে শেয়ার বলা হয়। শেয়ারহোল্ডারগণ তার শেয়ারের মালিকানা হস্তান্তর করার অধিকার রাখে।

৭. সদস্য সংখ্যা: কোম্পানি সংগঠনকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে: (ক) প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি (খ) পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির সদস্য সংখ্যা সর্বনিম্ন ২ জন এবং সর্বোচ্চ ৫০ জন। অন্যদিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির সর্বনিম্ন সদস্য সংখ্যা ৭ জন এবং সর্বোচ্চ স্মারকলিপিতে বর্ণিত শেয়ার সংখ্যা দ্বারা সীমিত।

৪. সমবায় সমিতি:

কম বিত্তসম্পন্ন সমশ্রেনি বা পেশার মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতির স্বার্থে সংঘবদ্ধ হয়ে সমধিকারের ভিত্তিতে সমবায় আইনের আওতায় যে সংগঠন গড়ে তোলে তাকে সমবায় সমিতি বলে।

সমবায় অর্থ হলো সম্মিলিত উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা। সর্বপ্রথম সমবায় সমিতি হলো রচডেল সমিতি যা ১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রচডেল নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়। কম আয়ের কতিপয় ব্যক্তি পারস্পরিক অর্থনৈতিক কল্যাণের লক্ষ্যে সম্মিলিত উদ্যোগে ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে সমবায় আইনের অধীনে সমবায় সংগঠন গঠন করা হয়। বাংলাদেশে সমবায় আইন ২০০১ সালের এবং সমবায় বিধিমালা ২০০৪ সালেল আওতায় সমবায় সমিতি গঠন ও পরিচালিত হয়।

সমবায় সমিতির নীতিমালা:

১. একতা: সমবায় সমিতির মূলনীতি “একতাই বল”। অর্থাৎ সকলে মিলিত বা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক কল্যান সাধনে কাজ করা।

২. সাম্য: সমবায় সমিতিতে সকল সদস্যই সমান মর্যাদার অধিকারী। এ সংগঠন সাম্যের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হয়।

৩. সহযোগিতা: সমবায় সমিতিতে প্রত্যেক সদস্যদের সহযোগিতামূলক মনোভাব ও পারস্পরিক সহানুভূতি থাকা অপরিহার্য।

৪. সততা: সমবায় সমিতিতে সততার গুণ থাকা আবশ্যক কেননা সততা ব্যাতীত প্রতিষ্ঠানে সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিবে। ফলে প্রতিষ্ঠান সফল হবে না।

৫. সেবা: সমবায় সমিতিতে সদস্যদের জনসেবার মানসিকতা থাকা আবশ্যক। 

৬. গণতন্ত্র: সমবায় সমিতি গণতান্ত্রিক নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়।

৭. সমান ভোটাধিকার: সমবায় সমিতিতে প্রত্যেক সদস্যদের সমান ভোটাধিকার থাকে। অর্থা আপনার মূলধন বেশি হলেও আপনার ১টি মাত্র ভোট থাকবে।

৮. নিরপেক্ষতা: সমবায় সমিতি নিরপেক্ষতার নীতি মেনে চলে। এখানে কারো পক্ষপাত করার সুযোগ নেই।

৯. মুনাফা বণ্টন: সমবায় ব্যবসায়ের সম্পর্ণ মুনাফা বণ্টন না করে অর্জিত মুনাফার ১৫% সঞ্চিত তহবিলে রাখা হয় আর ৩% উন্নয়ন তহবিলে রাখা হয়।

১০. স্থায়িত্বকাল: সমবায় সংগঠন একটি আইনসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান যা আইনের মাধ্যমে গঠিত, পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। সুতরাং যেকেউ চাইলেই এ ব্যবসায়ের অবসায়ন করতে পারবে না।

রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়:

জনগণের কল্যাণের স্বার্থে সরকার কর্তৃক গঠিত, পরিচালিত, ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়কে রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় বলে।

রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় সরকারের নিয়ম-কানুন পালন করে সরকারি উদ্যোগে গঠিত হয়। রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশ বা দেশের আইনসভায় বিশেষ আইনবলে অথবা বেসরকারি ব্যবসায়কে জাতীয়করণ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় গঠিত হতে পারে। কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হলো: বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, ওয়াসা, বিআরটিসি, বাংলাদেশ রেলওয়ে ইত্যাদি।

রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়ের বৈশিষ্ট্য:

১. স্বতন্ত্র গঠন প্রণালী: রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় সরকারি আইন অনুযায়ী গঠিত হয়ে থাকে। 

২. মালিকানা: রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়ের মালিকানা রাষ্ট্র নিজেই হয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়ের সকল সম্পদ রাষ্ট্রের এবং কর্মচারীরা প্রত্যক্ষ বা প্ররোক্ষভাবে রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়ে থাকে।

৩. আইনগত মর্যদা: রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় সরকারের বিশেষ আইন বলে গঠিত হয় বলে এটি পৃথক আইনগত সত্তার অধিকারী। এই ব্যবসায় নিজস্ব নামে পরিচিত হতে পারে এবং নিজস্ব সিলমোহর ব্যবহার করতে পারে।

৪. জনকল্যাণ: রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় গঠিত হয় মূলত জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে। দেশের অর্থনৈতির সঠিক নিয়ন্ত্রন ও সুষম বণ্টনের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় গঠিত হয়।

৫. রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা: রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় সরকার কর্তৃক নিয়োজিত পরিচালক পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হয়। সরকারি কর্মকর্তারাই ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন।

৬. বৃহদায়তন প্রকৃতি: রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় সাধারণত বৃহদায়তন প্রকৃতিতে গড়ে ওঠে। দেশের উন্নয়ণের জন্য প্রচুর পরিমাণে মূলধন বিনিয়োগ করে থাকে রাষ্ট্রীয় ব্যবসায়ে।

৭. স্থায়িত্বকাল: রাষ্ট্রীয় ব্যবসায় চিরন্তন প্রকৃতির হয়ে থাকে।