//ব্যবসায়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর?
ব্যবসায়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর? Save

ব্যবসায়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর?

ব্যবসায় অর্থ “ব্যস্ত থাকা” অর্থাৎ ব্যবসায় সেই সমস্ত মানবিক ক্রিয়াকালাপের সাথে সম্পর্কিত যেখানে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও বণ্টনের কাজে নিয়োজিত থাকে। একটি জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য ব্যবসায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আজকের ব্যবসায়ের বড় পরিধির জন্য আমরা আমাদের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে সুন্দর জীবনযাপন করতে পারছি।

আমরা জানি, ব্যবসায় একটি অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, যা মানুষের সীমাহীন চাহিদাগুলি পূরণের জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। আসুন জেনে নেই, ব্যবসায় কাকে বলে? মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে উৎপাদন ও বণ্টনসহ সকল বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যবসায় বলে। ব্যবসায় অবশ্যই বৈধ উপায়ে হতে হবে অর্থাৎ আপনি তখনই কোনো কাজকে ব্যবসায় বলতে পারবেন যদি এটি বৈধ ও মুনাফা অর্জনের জন্য পরিচালিত হয়।

ব্যবসায়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:

১. পণ্যদ্রব্য ও সেবাকর্ম উৎপাদন: 

ব্যবসায় মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য নতুন নতুন পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে বাজারজাত করে। বর্তমানে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুব সহজেই বাজার থেকে ক্রয় করে ভোগ করতে পারছে তা কেবল ব্যবসায়ের জন্য। আমাদের জীবনকে আরো সহজ ও সুন্দর করতে ব্যবসায় নানান ধরনের পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে যাচ্ছে।

২. প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার:

প্রাকৃতিক সম্পদ প্রকৃতির এক বড় উপহার। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের জন্য ব্যবসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন: খনিজ পদার্থ, বনজ সম্পদ, পানি সম্পদ ইত্যাদির যথাযথ ও দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন উপযোগ তৈরি করছে। ব্যবসায় প্রাকৃতিক সম্পদের এমনভাবে ব্যবহার করে যা পুরো মানবজাতির উপকারে কাজে আসে।

৩. দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন:

ব্যবসায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্যবসায়ের মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটে যার ফলে দেশের মানুষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পণ্য ও পরিষেবার বিনিময়ে অবদান রাখে। বিদেশে পণ্যসমূহ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় অবদান রাখে। সুতারাং বলা যায় ব্যবসায়ের ফলে দেশের মধ্যে মূলধন গঠিত হয়, সঞ্চয় বৃদ্ধি পায় যার মাধ্যমে দেশের জাতীয় আয় বৃ্দ্ধি পায়।

৪. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন:

জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন বলতে বুঝায় সুস্থ্য ও স্বচ্ছন্দ্য জীবনযাপন করা। একটি ব্যবসায় জনগনের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয় যার মাধ্যমে তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায়, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে।

৫. কর্মসংস্থান:

ব্যবসায় কর্মসংস্থানের একটি অন্যতম উৎস। এটি দেশের বিপুল সংখ্যক জনগনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। ব্যবসায়ের পরিচালনা করার জন্য এবং প্রযুক্তিগত কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের কর্মচারীর প্রয়োজন হয়। যেমন: হোটেল, শিল্প এবং পরিবহন সংস্থার মতো অনেক ধরণের ব্যবসায়িক হাউস ব্যবসায়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় যা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অনেক কর্মচারী বা শ্রমিকের। সুতরাং, ব্যবসায় দেশের বেকার সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে।

৬. সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি:

ব্যবসায় সরকারের রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ব্যবসায়কে নানন ধরনের কর প্রদান করতে হয় যেমন: আয়কর, বিক্রয় কর ইত্যাদি। এইসব কর সংগ্রহ করার মাধ্যমে সরকারের অর্থনেতিক অবস্থার তরান্বিত হয়। সুতরাং, সকল কর সরকারী রাজস্বতে অবদান রাখে এবং দেশের উন্নয়নেও সহায়তা করে।

৭. বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন:

ব্যবসায় বিদেশে পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। যেমন: বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, বাংলাদেশে থেকে বিভিন্ন দেশে পোশাক রপ্তানি করে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে বিভন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। আমরা জানি, যে দেশ যত বেশি রপ্তানি করে সে দেশ তত বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যায়। সুতারাং, নতুন নতুন শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে দেশীয় পণ্য উৎপদান করে তা বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করা যায়।

৮. যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন: 

দেশের ব্যবসায় বাণিজ্যের সঠিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন সঠিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিবহন সংস্থা। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। যার ফলে ব্যবসায়ের কাঁচামাল ও পণ্যসামগ্রী সুষ্ঠভাবে আনায়ন করা যায় এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের প্রসার ঘটে।

৯. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক:

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশের জন্য ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর মাধ্যমে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিকাশের ঘটে। এটি বিভিন্ন দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরিতে ও বজায় রাখতে সহায়তা করে। তাছাড়া, দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা এবং উন্নত কূটনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টি হতে সাহায্য করে। আমদানি ও রফতানি হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি। আর এই আমদানি ও রপ্তানি সৃষ্টি হয় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

১০. স্বনির্ভরতা:

ব্যবসায় দেশ ও ব্যক্তিদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সহায়তা করে। এটি নির্ভরতা হ্রাস করে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও সহায়তা করে। সুতরাং, দেশে ব্যবসায়ের বিকাশ স্বাবলম্বিতা, স্বনির্ভরশীলতা এবং আত্ম-সম্মান নিশ্চিত করে।

১১. বাজারের প্রসার:

বর্তমান আধুনিক বিশ্বে গ্রাহকদের প্রয়োজন বা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য ও সেবা তৈরি করা হয়। সুতরাং, গ্রাহকদের স্বাদ এবং ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী পণ্যগুলি বিকাশের জন্য দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরে উভয়ই গ্রাহকদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। যার ফলে বিশ্বজুড়ে গ্রাহকের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাজারের প্রসার ও বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য হতো যার ফলে বাজারও ছোট ছিল কিন্তু বর্তমানে বিদেশী গ্রাহকদের জন্যও পণ্য ও সেবা উৎপাদন করা হয় যার ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে।

১২. ব্যাংক ও বিমা:

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধির ফলে নিরাপদ লেনদেন এবং ঝুঁকি হ্রাসের  প্রয়োজন পড়ে যার ফলে সৃষ্টি হয় ব্যাংক ও বিমা। ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠার ফলে দেশের মধ্যে সঞ্চয় ও মূলধন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়।

১৩. সভ্যতা ও সংস্কৃতি: 

ব্যবসায় এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রসার ঘটেছে যার ফলে এক দেশের সাথে অন্য দেশের সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে বিভিন্ন দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদান প্রদানের পথ প্রসারিত হয়।

১৪. নগরায়ন: 

ব্যবসায় প্রতিষ্টান বৃদ্ধির ফলে এখন মানুষ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। কেউ অসু্স্থ হলে এখন আর পূর্বের মতো মূল শহরে থেকে সেবা নেওয়া প্রয়োজন পড়ে না। গ্রামে থেকেও মানুষ নানান সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে যার ফলে নগরায়নের উদ্ভব হচ্ছে।

সুতরাং যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ব্যবসায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাছাড়াও ব্যবসায় একটি দেশের অর্থনীতির পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্যবসায়গুলি পণ্য এবং পরিষেবা সরবরাহ করে। এটি দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করে এবং চাকরি সরবরাহ করে।