//বাংলা ব্যাকরণ কাকে বলে? এর ইতিহাস ও বিস্তরিত আলোচনা
বাংলা ব্যাকরণ কাকে বলে? এর ইতিহাস ও বিস্তরিত আলোচনা Save

বাংলা ব্যাকরণ কাকে বলে? এর ইতিহাস ও বিস্তরিত আলোচনা

ব্যাকরণটি এমন একটি উপায় যা বাক্য তৈরির জন্য শব্দগুলিকে একসাথে যুক্ত করা। অর্থাৎ ব্যাকরণ একটি কাঠামোগত নিয়ম বা সেট যা একটি প্রাকৃতিক ভাষায় ধারা, বাক্যাংশ এবং শব্দের সমন্বয়কে পরিচালনা করে।

প্রত্যেক ভাষারই চারটি মেীলিক অংশ থাকে যথাঃ ধ্বনি, শব্দ. বাক্য ও অর্থ। মূলত এক চারটি উপাদানের কার্যক্রম অর্থাৎ ধ্বনিগুলো কীভাবে উচ্চারিত হবে, শব্দগুলো কীভাবে গঠিত হয়, শব্দগুলোর রূপান্তর কীভাবে ঘটে এবং এই চারটিকে বাক্যে কীভাবে সাজানো বা বিন্যস্ত হবে এসব বিশ্লেষণ, বর্ণনা করে দেখানোর চেষ্টা থেকেই মূলত ব্যাকরণের উদ্ভব। 

যে শাস্ত্রে কোনা ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপর বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় ও প্রয়োগবিধি বিশদভাবে আলোচিত হয়, তাকে ব্যাকরণ বলে। [ বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, নবম-দশম শ্রেণি]

বি+আ+√কৃ+অন = ব্যাকরণ

ব্যাকরণ যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশেষভাব বিশ্লেষণ। ব্যাকরনকে বলা হয় ভাষার সংবিধান। ব্যাকরণ না জানলেও ভাষা ব্যবহার করা সম্ভব তবে শুদ্ধভাবে মনের ভাব বা ভাষা প্রকাশ করতে চাইলে আপনাকে ব্যাকরণের নিয়ম-কানুন জানা আবশ্যক। ইংরেজিতে আমরা ব্যাকরণকে বলে থাকি Grammar যার অর্থ ‘শব্দশাস্ত্র’।

ভাষাবিজ্ঞানীরা ব্যাকরণ সম্পর্কে অনেক একেক রকম সংজ্ঞা দিয়েছেন, যথাঃ

১. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতেঃ “ যে শাস্ত্র জানিলে ভাষা শুদ্ধরূপে লিখিতে, পড়িতে ও বলিতে পারা যায় তাহার নাম ব্যাকরণ।”

২. ড. সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায়ের মতেঃ ” যে বিদ্যা দ্বারা কোন ভাষাকে বিশ্লেষণ করিয়া তাহার স্বরুপটি আলোচিত হয় এবং সেই ভাষার গঠনে ও লিখনে এবং তাহাতে কথোপকথনে শুদ্ধরুপে তাহা প্রয়োগ করা যায় সে বিদ্যাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ বলে।”

৩. ড. হুমায়ুন আজাদের মতেঃ “ এখন ব্যাকরণ বা গ্রামার বলতে বোঝায় এক শ্রেণির ভাষা বিশ্লেষণাত্মক পুস্তক যাতে সন্নিবিষ্ট হয় বিশেষ বিশেষ ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগের সূত্রাবলি।”

৪. ড. সুকুমার সেনের মতেঃ “ কোন ভাষার উপাদান সমগ্রভাবে বিচার ও বিশ্লেষণ যে শাস্ত্রের বিষয় তাহাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ বলে।

ব্যাকরণের প্রকারভেদ সমূহঃ 

ড. সুকুমার সেন ব্যাকরণকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন:

  1. বর্ণনামূলক ব্যাকরণ
  2. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ
  3. তুলনামূলক ব্যাকরণ

ড. সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায় ব্যাকরণকে চার ভাগে ভাগ করেছেনঃ 

  1. বর্ণনামূলক ব্যাকরণ
  2. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ
  3. তুলনামূলক ব্যাকরণ
  4. দার্শনিক বিচারমূলক ব্যাকরণ
  • বর্ণনামূলক ব্যাকরণঃ এ ব্যাকরণ বিশেষ কোনো কালের কোনো একটি ভাষার রীতি ও প্রয়োগ বর্ণনা করা এর বিষয় এবং সে বিশেষ কালের ভাষা যথাযথ ব্যবহার করতে সাহায্য করা এর উদ্দেশ্য। বক্তারা কীভাবে কোনও ভাষা ব্যবহার করেন তা বিশ্লেষণ করে এবং তারা যে নিয়মগুলি অনুসরণ করছেন সেগুলি ছাড়িয়ে একটি বর্ণনামূলক ব্যাকরণ তৈরি করা হয়। অর্থৎ এটি কোনও ভাষা কীভাবে লিখিতভাবে এবং বক্তৃতায় ব্যবহৃত হচ্ছে তার একটি পরীক্ষা।
  • ঐতিহাসিক ব্যাকরণঃ আধুনিক বা কোনো নির্দিষ্ট যুগের ভাষাগত প্রয়োগরীতি আলোচনা করে আলোচ্য ভাষার রূপটির বিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করা এর লক্ষ্য। সময়ের সাথে সাথে একটি ভাষার ব্যাকরণগত বিকাশের অধ্যয়ন।
  • তুলনামূলক ব্যাকরণঃ তুলনামূলক দুটি জিনিসকে তুলনা করতে ব্যবহৃত বিশেষণ বা ক্রিয়াপদের রূপ। অর্থাৎ যে শ্রেণীর ব্যাকরণ কোনো বিশেষ কালের বিভিন্ন ভাষার গঠন, প্রয়োগরীতি ইত্যাদির তুলনামূলক আলোচনা করে থাকে, তাহলে তাকে তুলনামূলক ব্যাকরণ।
  • দার্শনিক বিচারমূলক ব্যাকরণঃ ভাষায় অন্তর্নিহিত চিন্তা প্রণালিটি আবিষ্কার ও অবলম্বন করে সাধারণভাবে কিংবা বিশেষভাবে ভাষার রূপের উৎপত্তি ও বিবর্তন কীভাবে ঘটে থাকে, তার বিচার করা এর পর্যায়ভুক্ত।

ব্যাকরণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাঃ

  1. শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে আপনাকে ব্যাকরণ জানা প্রয়োজন
  2. ভষাকে শুদ্ধভাবে লিখতে ও পড়তে আপনার ব্যাকরণ জানা প্রয়োজন
  3. আপনার ভাষা সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্যও ব্যাকরণ পাঠ করা প্রয়োজন
  4. ব্যাকরণ ভাষার জ্ঞানকে আরও নান্দনিক করে তোলে
  5. নিজস্ব ভাষার প্রয়োগের নিয়ম নীতি জানতে ব্যাকরন পাঠ করা প্রয়োজন।

ব্যাকরণের ইতিহাসঃ

পুর্তুগিজ পাদ্রি মনোএল দ্য আসসুম্পসাঁও প্রথমবারের মতো বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন ১৭৩৪ সালে ঢাকার ভাওয়ালে। প্রথম রচিত এ বাংলা ব্যাকরণের নাম ছিল, পুর্তুগিজ ভাষায়ঃ ‘ভোকাবুলারিও এম ইদিওনা বেনগলিয়া, ই পর্তুগিজ: দিভিদিদো এমদুয়াস পার্তেস’। পরবর্তীতে ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড ইংরেজিতে বাংলা ব্যাকরন রচনা করেন ১৭৭৮ সালে। এই ব্যাকরণের নাম ছিলঃ ‘A Grammar of the Bengali Language’. এই গ্রন্থটিকে পরবর্তীতে আবার সমৃদ্ব করে রচনা করেন উইলিয়াম কেরি ১৮১৮ সালে।

রাজা রামমোহন রায় প্রথমবারের মতো বাঙালি হিসেবে পূর্নঙ্গ ব্যাকরন রচনা করেন এবং তার রচিত গ্রন্থটির নাম ‘ গৌড়ীয় ব্যাকরণ’। বর্তমানে আমরা ব্যাপক অনুশীল করে থাকি ড. সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায়ের রচিত ব্যাকরণ গ্রন্থ ‘ভাষাপ্রকাশ বাঙ্গলা ব্যাকরণ’(১৯৩৯) এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচিত ‘ব্যাকরণ পরিচয়’ (১৯৫৩)।

 [Most data are collected from: বাংলা ব্যাকরণ নির্মিতি, মুহাম্মদ রুকুন-উজ-জামান এবং মো. সাজ্জাদুল বারী]

Read More:

গৌড়ীয় ব্যাকরণ এর রচয়িতা কে?

বাংলা সাহিত্যের ছন্দ নিয়ে যত প্রশ্ন ও উত্তর

মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস ১৫২৬-১৮৫৭ খ্রি.